আইভারমেকটিনকে অবহেলা নয়

ছোটবেলা থেকেই শুনছি, গভীর সমুদ্রে নিমজ্জিত মানুষ বাঁচার জন্য খড়কুটোও ধরতে চায়। ২০২০ সালের প্রথমার্ধে পৃথিবী যখন করোনা মহামারিতে দিশেহারা, তখন বাংলাদেশের এক চিকিৎসক পরজীবীনাশক ওষুধ আইভারমেকটিন এই রোগের চিকিৎসায় ব্যবহারের কথা জানান। সেই থেকে আজ অবধি নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও চিকিৎসকেরা গবেষণা ও চিকিৎসার ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলেছেন।

বেশ কয়েক মাস পর আইভারমেকটিনের ব্যবহার যে কার্যকর, বিভিন্ন দেশের সমীক্ষায় এখন তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। শুধু প্রতিষেধক হিসেবেই নয়, প্রতিরোধক হিসেবেও এর কার্যকারিতা পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া থেকে ইউরোপ হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সমীক্ষায় এই আশাব্যঞ্জক খবর পাওয়া গেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিসরে নানা স্বীকৃতি মিললেও দেশে এখনও কোভিড চিকিৎসায় আইভারমেকটিন স্বীকৃত ওষুধ নয়।

বিশ্বে যখন কোভিড চিকিৎসায় কোন ওষুধ ব্যবহার করা হবে তা নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ছিল, তখন আইভারমেকটিন আশার আলো দেখায়। পরজীবীনাশক এই ওষুধ জিকাসহ বিভিন্ন আরএনএ ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। দেশে এই ওষুধের প্রথম পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু করেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. তারেক আলম ও তার সহকর্মীরা। তারা এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রকাশিত অস্ট্রেলিয়ার মোনাস বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণাপত্রের ভিত্তিতে এ চিকিৎসা শুরু করেন।

ডা. তারেক আলম ও ডা. রুবাইয়ুল মোরশেদ এবং তাদের সহকর্মীরা সম্প্রতি ইউরোপিয়ান জার্নাল অব মেডিসিন অ্যান্ড হেলথ সায়েন্সে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রবন্ধে আইভারমেকটিন প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহারের কার্যকারিতার কথা বলেছেন।

এই প্রবন্ধে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজে ১১৮ জন স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর এই সমীক্ষা পরিচালিত হয়েছে। এদের দুই দলে ভাগ করে সমীক্ষাটি করা হয়েছে। ৫৮ জনের এক দলকে মাসিক ১২ মিলিগ্রাম আইভারমেকটিন টানা চার মাস দেয়া হয়েছে। তবে ৬০ জনের আরেক দলকে ওষুধ দেয়া হয়নি। উভয় দলই কোভিড রোগীর সেবা করেছেন, অর্থাৎ কোভিড রোগীদের সংস্পর্শে এসেছেন। চার মাস পরে দেখা গেছে, যাদের ওষুধ দেয়া হয়নি তাদের মধ্যে ৪৪ জন অর্থাৎ ৭৩.৩ শতাংশ আরটিপিসিআর পরীক্ষায় কোভিড পজিটিভ হয়েছেন। আর যাদের আইভারমেকটিন দেয়া হয়েছে, তাঁদের মধ্যে মাত্র ৪ জন বা ৬ দশমিক ৯ শতাংশ কোভিড পজিটিভ হয়েছেন।

এ ছাড়া সম্প্রতি কোভিড চিকিৎসায় আইভারমেকটিনের ব্যবহার নিয়ে আইসিডিডিআরবি যে আরসিটি পরিচালনা করেছিল, সেখানে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে শুধু পাঁচ দিনের আইভারমেকটিনের ডোজে ভাইরাসের তীব্রতা হ্রাস পায়।

ভারতের ভুবনেশ্বরের এক হাসপাতালে পরিচালিত সমীক্ষায়ও দেখা গেছে, স্বাস্থ্যকর্মীদের যাদের প্রতিরোধক হিসেবে আইভারমেকটিন দেয়া হয়েছে, তাদের কোভিড আক্রান্ত হওয়ার হার ৭৩ শতাংশ কম, যাদের প্লাসিবো দেয়া হয়েছে, তাদের তুলনায়।

প্রতিরোধক হিসেবে ইতিমধ্যে আইভারমেকটিনের ব্যবহার অনেক জায়গাতেই হচ্ছে। ভারতে এ মাসে অনুষ্ঠেয় মাঘ বা কুম্ভ মেলায় যে ২০ হাজার সন্ন্যাসী ও দর্শনার্থী অংশ নেবেন, তাদের কোভিড পরীক্ষা করানোর পাশাপাশি প্রতিরোধক হিসেবে আইভারমেকটিন দেয়া হবে। পাশাপাশি মেলার স্বেচ্ছাসেবকদেরও প্রতিরোধক হিসেবে এই আইভারমেকটিন দেয়া হবে। প্রায় দেড় মাসব্যাপী এই মেলার প্রথম, সপ্তম ও ৩০ তম দিনে তাঁদের আইভারমেকটিন দেয়া হবে।

সম্প্রতি বুলগেরিয়া ও ইসরাইলের মেধাবী চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা আইভারমেকটিনের কার্যকারিতা ও সফলতা নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। বুলগেরিয়ার এক সমীক্ষায় প্রতিরোধক হিসেবে আইভারমেকটিনের কার্যকারিতা আছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। বুলগেরিয়ার সোফিয়া নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত এক খবরে জানা দেশটির চিকিৎসক অধ্যাপক ইভো পেট্রভ এ কথা বলেছেন। তিনি আরও বলেন, ৮০০ চিকিৎসকের ওপর পরিচালিত এই সমীক্ষায় দেখা গেছে, যারা প্রতিরোধক হিসেবে আইভারমেকটিন সেবন করেছেন, তাদের কোভিড আক্রান্ত হওয়ার হার খুবই কম। আবার যাঁরা আক্রান্ত হয়েছেন, তাঁদের উপসর্গও আবার খুব মৃদু।

আইভারমেকটিনের আরেকটি বড় সুবিধা হলো, এটি অত্যন্ত সস্তা। চিকিৎসকদের নির্দেশিত ডোজের দাম পড়ে ১০০ টাকার বেশি নয়। তবে তার সঙ্গে অন্যান্য ওষুধ লাগলে ভিন্ন কথা। সে জন্য উল্লিখিত প্রবন্ধের সহ লেখক ডা. রুবাইয়ুল মোরশেদ এটিকে ‘জনগণের ওষুধ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকেন।

আরেকটি ব্যাপার, এতদিন বলা হয়েছে, আইভারমেকটিন মৃদু উপসর্গের ক্ষেত্রে কাজ করে থাকে। কিন্তু ডা. তারেক আলমের অভিজ্ঞতা বলে, অনেক জটিল ও কো-মর্বিড রোগীদের ক্ষেত্রেও এর কার্যকারিতা পাওয়া গেছে। এমনকি ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তি দীর্ঘদিন অ্যাজমায় ভুগছেন এবং ৩৫ বছর ধরে স্টেরয়েড নিচ্ছেন, তেমন রোগীর চিকিৎসায়ও আইভারমেকটিন কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। আরেকজন ৭৬ বছর বয়সী নারীও আইভারমেকটিন সেবন করে দ্রুত আরোগ্য লাভ করেছেন। ১৬ দিনের মধ্যে নেগেটিভ হয়েছেন তিনি। অর্থাৎ ধরা পড়ার পর পরই আইভারমেকটিন দেয়ার ফলে রোগীর তেমন জটিলতা হয়নি।

পাশাপাশি অনেক চিকিৎসকই আক্রান্ত ব্যক্তির স্বজন বা পরিবারের সদস্যদের সতর্কতার অংশ হিসেবে আইভারমেকটিন সেবনের নির্দেশনা দিয়েছেন। রোগীদের অভিজ্ঞতা বলে, এতে ভালো কাজ হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, আক্রান্ত ব্যক্তি বয়সে তরুণ, বাসায় থেকেই চিকিৎসা নিয়েছেন, কিন্তু পরিবারের বয়স্ক সদস্যরা আক্রান্ত হননি। এর আরও অনেক কারণ থাকতে পারে, তবে একটি হচ্ছে প্রতিরোধক হিসেবে আইভারমেকটিন সেবন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মনোনীত সমীক্ষায় আইভারমেকটিনের কার্যকারিতা মিলেছে। লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক অ্যান্ড্রু হল এরূপ ১১টি সমীক্ষার প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশ করেছেন। এতে দেখা গেছে, আইভারমেকটিন সেবনে হাসপাতালে অবস্থান করার সময় হ্রাসের পাশাপাশি সুস্থ হওয়া ও বেঁচে থাকার হারও বেড়েছে। বিশ্বের ২১টি দেশে এখন আইভারমেকটিনের র‌্যান্ডমাইজড ট্রায়াল হচ্ছে। তবে সঠিক ডোজ নিশ্চিত করায় জোর দিয়েছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের আরেক সমীক্ষায় দেখা গেছে, আইভারমেকটিন দেয়ার ফলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার রোগীদের মৃত্যু ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো গেছে। সমীক্ষায় যে ৫৭৩ জন রোগীকে আইভারমেকটিন দেয়া হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে মাত্র আট জন মারা গেছেন। আর যে ৫১০ জনকে প্লাসিবো (ওষুধের মতো বস্তু) দেয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে ৪৪ জন মারা গেছে। কিন্তু কোনো দেশই এই ওষুধ সম্পর্কে স্পষ্ট বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিচ্ছে না। সম্ভবত এর কারণ হচ্ছে, মহামারিও হয়তো শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক-অর্থনীতি মুক্ত থাকতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে এই আইভারমেকটিন সংক্রান্ত এক শুনানিতে যা ঘটল, তাতে এমনটা মনে হওয়াই স্বাভাবিক।

দেশটির বেশ কয়েকজন চিকিৎসক এই ওষুধের জাদুকরী কার্যকারিতা সম্পর্কে জানাতে সিনেট শুনানিতে অংশ নেন, যদিও দেশটির ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অর হেলথ থেকে শুরু করে সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন কেউই এই ওষুধের কথা বলে না। শুনানিতে অংশ নেয়া সিনেটর গ্যারি পিটার্স উলটো এই চিকিৎসকদের নির্লজ্জের মতো সমালোচনা করেন। বলেন, এই চিকিৎসকেরা রাজনৈতিক কথা বলছেন, বিজ্ঞানভিত্তিক নয়। তারা টিকার ভূমিকাও খাটো করছেন, যদিও আদতে তারা সেরকম কিছু বলেননি। যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার গণমাধ্যমও এটি এড়িয়ে গেল। গণমাধ্যম ট্রায়ালসাইটনউিজ বলছে, সম্ভবত এই ওষুধের দাম কম হওয়ার কারণেই এত অবহেলা।

বর্তমানে ডা. তারেক আলম ও ডা. রুবাইয়ুল মুর্শেদের নেতৃত্বে সরকার মনোনীত ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হচ্ছে। যদিও ইচ্ছা-অনিচ্ছায় বাংলাদেশের অনেকেই বুঝে বা না বুঝে এর বিরোধিতা করছেন, তবে ভিন্ন স্বরও জারি আছে। বাংলাদেশের সন্তানেরাই প্রথম এই পরজীবীনাশক ওষুধ কোভিড চিকিৎসায় ব্যবহারের পথ দেখিয়েছেন, ‘বাংলাদেশ সরকার’ তার স্বীকৃতি দিয়ে আমাদের মুখ উজ্জ্বল করতে পারে। বর্তমানে সবার দৃষ্টি এখন টিকার দিকে। যদিও টিকার পূর্ণাঙ্গ কার্যকারিতার জন্য আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে, তারপরও আইভারমেকটিনের সঙ্গে এর বিরোধ নেই। আমরা যেন খোলা মন নিয়ে সব কিছু দেখার চেষ্টা করি।

লেখক : চিকিৎসক, অধ্যাপক, পেইন মেডিসিন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল

১৫ জানুয়ারি, ২০২১ ১৪:২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *