জান্নাতীদের নরকবাস কি বন্ধ হবে

অভাবী ঘরের ছেলেমেয়েরা শহরের বাসাবাড়িগুলোতে পেটে–ভাতে আর সামান্য কিছু বেতনে কাজ করতে আসে। এক হিসাবে দেখা যায়, দেশের শহর নগর গ্রাম মিলিয়ে শিশু গৃহকর্মীর সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, (২০১৬) ২০০৬ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত ১০ বছরে সংবাদপত্রে প্রকাশিত শিশু গৃহকর্মী নিগ্রহের প্রায় ১ হাজার ৭০টি ঘটনা প্রকাশিত হয়। এদের মধ্যে ৫৬৫টি শিশু মারা গেছে। প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৫০টি শিশু গৃহকর্মীর মৃত্যুর খবর সংবাদপত্রে ছাপা হয়। সর্বশেষ ২৪ অক্টোবর শিশু জান্নাতী মারা গেছে ঢাকার মোহাম্মদপুরে। বাবা তার রিকশা চালান বগুড়ায়। ‘অসুস্থ মেয়েক দ্যাকতে হলি জলদি’ ঢাকায় আসার জন্য তাঁকে তাড়া দেওয়া হয় মুঠোফোনে। খবর করেন পিরোজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাঈদ আহমেদ। একসময় প্রকৌশলী সাঈদ কাজ করতেন বগুড়ায়, সেখান থেকেই তাঁর ‘কালেকশনে’ চলে আসে জান্নাতী। বাবা জানু মোল্লা মেয়ে জান্নাতীকে দেখেন সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের লাশকাটা ঘরে। জীবন্ত জান্নাতীকে তাঁর আর দেখা হয়নি। আসলে ২৩ অক্টোবর রাতের আগেই জান্নাতীর মৃত্যু হয়। তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেলে রাখা হয় রান্নাঘরের মেঝেতে। প্রকৌশলী সাঈদের স্ত্রী রোকসানা পারভীন পুলিশের হেফাজতে এসব কথা জানিয়েছেন। পুলিশ তাঁকে আটক করতে পেরেছে। জানু মোল্লা অদৃষ্টকে দোষ দিয়ে কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে লাশ আর কিছু টাকা নিয়ে চোখ মুছে বগুড়ায় ফেরত যাননি। হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। 

ঢাকার রিকশাচালক আবদুস সোবাহান ২০১৬ সালের মে মাসে যে কাজটা করতে পারেননি, মফস্বলের রিকশাচালক জানু মোল্লা সেটা করেছেন। সাধারণত এসব ক্ষেত্রে পুলিশ নিহত শিশুর পিতা–মাতাকে পরামর্শ দেয়। মাঝেমধ্যে লিখেও দেয়। স্বাক্ষরটা শুধু থাকে বাদীর। আবদুস সোবহানের কন্যাশিশু গৃহকর্মী হাসিনা ২০১৬ সালে নির্মম নির্যাতনে যখন মারা যায়, তখন কেউ তঁাকে হত্যা মামলার পরামর্শ দেয়নি, পাশে দাঁড়ায়নি। বাসাবাড়িতে কাজে দেওয়ার চার মাসের মাথায় শিশু হাসিনার মৃত্যু হয়। হাসিনার সারা শরীরে জান্নাতীর মতো নির্যাতনের চিহ্ন ছিল। ময়নাতদন্তে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল বলেও আলামত পাওয়া যায়। জান্নাতীর ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এখনো পাওয়া না গেলেও সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গ সূত্র জানিয়েছে, জান্নাতীর শরীরে নতুন-পুরোনো অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন আছে। তাঁরা ধারণা করছেন, মৃত্যুর আগে জান্নাতী ধর্ষণের শিকার হয়েছিল (প্রথম আলো অনলাইন, ২৫ অক্টোবর ২০১৯)। মেয়ে মারা যাওয়ার পর আবদুস সোবহান সপরিবার ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে যান। যাওয়ার আগে সোবহান বলছিলেন, ‘আমার বাড়ি নাই, ঘর নাই, কিছু নাই। বাচ্চাডারে লয়া দুই জামাই–বউ আইছিলাম ঢাহায়। ভাবছিলাম সুন্দরভাবে চলব। হেয় বাচ্চাডারে কীভাবে মারল, হে কি মানুষ না পশু?’ তখন বলা হয়েছিল, আসামিরা গ্রেপ্তার হয়েছেন। শিগগিরই এ মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। অভিযুক্তরা এখন কোথায়? 

বিচারের আশা না করে একইভাবে ঢাকা ছেড়ে গিয়েছেন শারীরিক প্রতিবন্ধী বাবা দুলাল মিয়া তাঁর আট বছরের মেয়ে ফাতেমার লাশ নিয়ে। গত ১ আগস্ট এক চিকিৎসক দম্পতির গৃহকর্মী ফাতেমা মারা যায়। দম্পতি বলেন, ডেঙ্গুতে মরেছে ফাতেমা। লাশ দাফনের আগে গোসলের সময় শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন এবং গোপনাঙ্গে রক্ত দেখে স্বজনেরা ঘটনাটি পুলিশকে জানান। একটু হইচইয়ের বুদ্‌বুদ ওঠে, মতিঝিল–খিলগাঁও থানার দড়া টানাটানি চলে কয়েক দিন, তারপর সব ঠান্ডা। ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, রাজধানীর উত্তরায় শিশু গৃহকর্মী হনুফা আক্তারের (১১) মৃত্যুকেও শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। লক্ষ্মীপুরের ফুটফুটে শিশু হনুফা কেন আত্মহত্যা করতে যাবে, সে প্রশ্ন করার কেউ নেই। 

প্রশ্ন যাঁরা তোলেন বা তুলতে পারেন, তাঁরাও খুব জোরালোভাবে লেগে থাকেন, তা বলা যাবে না। ৩০ মার্চ ২০১৭, মোহাম্মদপুরের শাহজাহান রোডের একটি বাড়িতে ঐশী (১১) নামের এক শিশু গৃহকর্মীর ‘অস্বাভাবিক’ মৃত্যুর ঘটনায় গৃহশ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্ক যথাসময়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের আহ্বান জানিয়েছিল। ব্যস, এ পর্যন্তই। 

২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে নারায়ণগঞ্জে চাষাঢ়ায় বেইলি টাওয়ারে পঞ্চম তলায় জনৈক আয়েশা বেগমের বাসায় রাজিয়া নামের এক গৃহকর্মী মারা গেলে তার লাশ আত্মীয়স্বজনের কাছে হস্তান্তর না করে তাকে পাঠানটুলী কবরস্থানে দাফন করা হয়। কবরস্থানের কাগজপত্রেও আসল পিতৃপরিচয় গোপন রেখে ভুয়া ঠিকানা দেওয়া হয়। এসব নিয়ে গণমাধ্যম শোরগোল বাধালে সিপিবি আর বাসদ উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দেয়। দু–একটা ছোটখাটো পথসভা বা মিছিলও করে থাকতে পারে। তার বেশি কিছু না। 

হাজার হাজার অভিযোগের সুরাহা হয় না। টাকার বিনিময়ে নির্যাতনের লাইসেন্স নবায়ন করে হত্যাকারীরা। তবে লেগে থাকলে আর প্রশাসন সদয় থাকলে বিচার যে হয়, তার এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত আদুরি নির্যাতন মামলা। প্রায় চার বছর সময় লাগলেও শাস্তি হয়েছিল নির্যাতনকারীর। পটুয়াখালী সদর উপজেলার কৌরাখালী গ্রামের ১১ বছরের মেয়ে আদুরিকে ২০১৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকার একটি ডাস্টবিন থেকে পুলিশ যখন উদ্ধার করেছিল, তখন শিশু আদুরি ছিল মৃতপ্রায়। 

মামলা হয় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে। সে মামলার রায়ে গৃহকর্ত্রীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের রায় দিয়েছিলেন আদালত। পুলিশ আদুরিদের সঙ্গে ছিল, আদুরির মা অনেক চাপের মধ্যেও আপস করেননি। আদুরির উদাহরণ আরও তৈরি হোক। জান্নাতীদের নরকবাস শেষ হোক। সব শিশু তার নিজের পরিবারের সঙ্গে থাকুক। পেট ভরে খাক আর স্কুলে যাক। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এটা কি খুব বেশি চাওয়া? 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *