দেশে ২ কোটি মানসিক রোগী


জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ নারীর চেয়ে পুরুষের মধ্যে বিষন্নতা বেশি। অন্যদিকে গ্রামের চেয়ে শহরের মানুষ বেশি বিষন্ন।

দেশে দুই কোটির বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কোনো নাকোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। এদের মধ্যে ৯২ শতাংশ কোনো চিকিৎসাই নেয় না। এই তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপের (২০১৮-১৯)। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে এক অনুষ্ঠানে জরিপের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। জরিপে ১৩ ধরনের মানসিক রোগের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তাতে দেখা যায়, মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগে বিষগ্রতায়। এই হার ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। নারীর চেয়ে পুরুষের মধ্যে বিষন্নণতা বেশি। অন্যদিকে গ্রামের চেয়ে শহরের মানুষ বেশি বিষন্ন। দেশের মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে এর আগের জরিপটি হয়েছিল ২০০৩ সালে। ওই জরিপে দেখা গিয়েছিল, ১৬ দশমিক ০৫ শতাংশ বয়স্ক মানুষ কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। বর্তমান জরিপে দেখা যাচ্ছে, ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ মানসিক রোগগ্রস্ত। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলেছেন, শতকরা হিসাবে আক্রান্তের হার কাছাকাছি থাকলেও গত ১৬ বছরে জনসংখ্যা অনেক বেড়ে যাওয়ায় মোট রোগীর সংখ্যাও বেড়ে গেছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি যৌথভাবে এই জরিপ করেছে। জরিপে কারিগরি সহায়তা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থ। জরিপকারীরা এ বছর এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করেন।

জরিপের তথ্য প্রকাশ অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যকে বাদ দিয়ে মানুষের স্বাস্থ্য নিশ্চিত হয় না। প্রতি দুই লাখ রোগীর জন্য মাত্র একজন করে সাইকোলজিষ্ট বা সাইকিয়াট্রিস্ট আছেন। এটা অপ্রতুল। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যকে একীভূত করার চিন্তা করছে সরকার। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ৭ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের ১৪ শতাংশ মানসিক রোগেআক্রান্ত। এই বয়সীদের মধ্যে অটিজমসহ স্নায়বিক রোগ অনেক বেশি। মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার পরও ৯৫ শতাংশ শিশু-কিশোর কোনো চিকিৎসা নেয় না। জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও জরিপের প্রধান গবেষক ফারুক আলম। তিনি বলেন, আদমশুমারির তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি অনুসরণ করে দেশের ৪৯৬টি নমুনা এলাকা থেকে প্রশিক্ষিত জরিপকারীরা তথ্য সংগ্রহ করেছেন। প্রতিটি বিভাগ ও প্রতিটি জেলা থেকে তথ্য নেওয়া হয়েছে। শহর ও গ্রামসমান গুরুত্ব পেয়েছে। ৭ হাজার ২৭০ জন নারী-পুরুষ এবং ২ হাজার ২৭০ জন শিশুর তথ্য জরিপকারীরা সংগ্রহ করেন।

জরিপে দেখা গেছে, মানসিক রোগে আক্রান্ত ৯২দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা নিতে পারে না বা চিকিৎসা নেয় না। চিকিৎসা না নেওয়ার হার নারীদের ও গ্রামের মানুষের মধ্যে বেশি। যে ৮ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা নেয়, তাদের বড় অংশটি চিকিৎসা নেয় চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে। মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ রোগী চিকিৎসা নেয় বিশেষায়িত হাসপাতালে । আবার ২ দশমিক ২ শতাংশ রোগী চিকিৎসা নেয় হোমিওপ্যাথি, আয়ুর্বেদ ও ইউনানি চিকিৎসকের কাছ থেকে। চিকিৎসা গ্রহীতাদের ১৭ শতাংশ নিয়ম মানে না বা চিকিৎসা অব্যাহত রাখে না। এই প্রবণতা নারীদের মধ্যে অনেক বেশি। অনুষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক মোহিত কামাল বলেন, ’আমাদের মন অবহেলার শিকার। শিশু-কিশোরদের মন পড়ে থাকছে মুঠোফোনে। এনিয়ে ঘরে ঘরে হাহাকার। এসব শিশু-কিশোরকে নিয়ে বাবা-মায়েদের ভিড় বাড়ছে আমাদের চেম্বারে ।’ জরিপে শিশু-কিশোরদের ৮ ধরনের মানসিক রোগের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, অটিজমসহ নানা ধরনের স্নায়বিক রোগে ভুগছে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ শিশু-কিশোর। এই রোগ ছেলেদের মধ্যে বেশি। মানসিক স্বাস্থ্য ইনষ্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক হেলাল উদ্দীন আহমেদ বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে জনসচেতনতা আরও অনেক বাড়াতে হবে। চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোরও সুপারিশ করেন তিনি। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে স্বাস্থ্যসচিব (সেবা বিভাগ) মো. আসাদুল ইসলাম, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ, অতিরিক্ত মহাপরিচালক এ এইচ এম এনায়েত হোসেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি বর্ধন জং রানা প্রমুখ বক্তব্য দেন।

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *