ধানের বীজ রাখার নতুন পদ্ধতি, ‘ইরি কোকুন’

ব্যাগের মুখ আটকে রাখলে তার মধ্যে কোনো আর্দ্রতা ঢুকতে পারে না। ফলে সবকিছুই থাকে সতেজ। ব্যাগটির মধ্যে ৪০ থেকে ৫০ মণ ধান রাখা যায়। এটাই ‘ইরি কোকুন’। ৩ আগস্ট খুলনার ডুমুরিয়ার বারাতিয়ায়।  প্রথম আলো

ব্যাগের মুখ আটকে রাখলে তার মধ্যে কোনো আর্দ্রতা ঢুকতে পারে না। ফলে সবকিছুই থাকে সতেজ। ব্যাগটির মধ্যে ৪০ থেকে ৫০ মণ ধান রাখা যায়। এটাই ‘ইরি কোকুন’। ৩ আগস্ট খুলনার ডুমুরিয়ার বারাতিয়ায়। প্রথম আলো বেশ বড় আকারের রাবারের একটি ব্যাগ। ওই ব্যাগের মুখ আটকে রাখলে তার মধ্যে কোনো আর্দ্রতা ঢুকতে পারে না। ফলে সবকিছুই থাকে সতেজ। ব্যাগটির মধ্যে ৪০ থেকে ৫০ মণ ধান রাখা যায়। এটাকেই বলা হয় ‘ইরি কোকুন’।

ধানের বীজ সংরক্ষণের জন্য খুলনার ডুমুরিয়ার বারাতিয়া ও শরাফপুর গ্রামের কৃষকেরা এখন ওই ইরি কোকুনে ধান রাখা শুরু করেছেন। এর আগে কৃষকেরা ধান রাখতেন বস্তা বা গোলায়।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, ইরি কোকুন হলো বাংলাদেশে ব্যবহৃত বীজ সংরক্ষণে কৃষির সর্বশেষ প্রযুক্তি। আগে কৃষক মাটির তৈরি কলস, জালা বা কুলায় বীজ সংরক্ষণ করতেন। কখনো কখনো গোলায় বীজ রাখতেন। এতে বীজের মান ভালো থাকত না। পোকার আক্রমণও বেশি ছিল। পরে কৃষক বস্তা বা প্লাস্টিকের পাত্রে বীজ রাখা শুরু করেন। কিন্তু এতেও বীজের মান ভালো রাখা সম্ভব হয়নি। ওই পদ্ধতিতে অনেক বস্তা বা পাত্রের প্রয়োজন হতো। ওই ব্যবস্থারই বিকল্প হিসেবে এসেছে ইরি কোকুন। এটি একটি ব্লাডারের মতো পাত্র, যেটিতে বীজ রাখলে বড় হয়। এটিতে ৪০ থেকে ৫০ মণ বীজ রাখা সম্ভব। এতে বাইরে থেকে বাতাস ঢুকতে পারে না, ফলে বীজে আর্দ্রতার পরিমাণ ঠিক থাকে এবং পোকামাকড়েরও কোনো আক্রমণ হয় না। এটি বাড়ির উঠানে রাখলেও রোদ, বৃষ্টি, খরায় বীজের কোনো গুণগত মান নষ্ট হয় না। এই বীজের অঙ্কুরোদ্‌গমক্ষমতাও খুব বেশি। এটি ফিলিপাইন, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশে আগে ব্যবহৃত হতো। 

বর্তমানে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে চলমান জাতীয় কৃষি প্রযুক্তি প্রোগ্রাম ফেস-২ (এনএটিপি) প্রকল্পের আওতায় এটি বাংলাদেশে এনে কৃষকের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার ডুমুরিয়া, দাকোপ ও বটিয়াঘাটা উপজেলায় দুটি করে ইরি কোকুন দেওয়া হয়েছে। কৃষক গ্রুপের মধ্যে দেওয়া এই ইরি কোকুন ওই এলাকার সব কৃষকই ব্যবহার করতে পারবেন।

ডুমুরিয়ায় পাওয়া দুটি ইরি কোকুন দেওয়া হয়েছে শরাফপুর গ্রামের কমন ইন্টারেস্ট গ্রুপের (সিআইজি) কৃষক সরোয়ার সরদার ও বারাতিয়া গ্রামের সিআইজি কৃষক নবদ্বীপ মল্লিককে। তাঁদের মাধ্যমে ওই এলাকার কৃষকেরা আগামী বছরের জন্য ধানের বীজ সংরক্ষণ করছেন।

ইরি কোকুনে ২০ মণ ব্রি-৬৭ জাতের ধানের বীজ রেখেছেন সরোয়ার সরদার। তিনি বলেন, ‘এটি বীজ সংরক্ষণের অত্যন্ত আধুনিক একটি প্রযুক্তি, এটি পেয়ে আমি অত্যন্ত খুশি। আমি যে বীজ সংরক্ষণ করেছি, তাতে আমার পুরো গ্রামের কৃষকদের মধ্যে বীজ বিতরণ করতে পারব।’

বারাতিয়া গ্রামের নবদ্বীপ মল্লিক বলেন, বীজ সংরক্ষণের এত সুন্দর জিনিস আছে, আগে জানা ছিল না। মানসম্মত বীজ সংরক্ষণে এটির ভূমিকা অপরিসীম। এটির মাধ্যমে ডিলার বা কোম্পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমবে এবং বীজ সিন্ডিকেট থেকে কৃষক রক্ষা পাবেন।

এ বিষয়ে ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মোছাদ্দেক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এবার উপজেলায় এনএটিপি-২ প্রকল্পের মাধ্যমে দুজন সিআইজি কৃষককে এটি সরবরাহ করা হয়েছে। বীজ সংরক্ষণের এটি সর্বশেষ একটি প্রযুক্তি। এটি ডুমুরিয়ার কৃষির উন্নয়নে এবং কৃষক পর্যায়ে উন্নত বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে খুলনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের উপপরিচালক পঙ্কজ কান্তি মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ইরি কোকুনের মধ্যে ধান রাখলে কোনো অবস্থাতেই ওই ধান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা নেই। শুধু তা-ই নয়, ওই ইরি কোকুন ইঁদুরেও কাটতে পারে না। ফলে নিরাপদে ধান রাখা যাবে। সরবরাহ কম থাকায় সব উপজেলায় সেটা দেওয়া সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *