বাইরে বেরিয়ে শেখা

কেউ ভোলা থেকে এসে ভর্তি হন ঢাকায়। কেউবা চট্টগ্রাম থেকে পড়তে যান দিনাজপুরে। কেউবা সুযোগ পান ভিনদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। যেখানেই যান না কেন, বাইরে বেরোলেই চোখের সামনে দুনিয়াটা বদলে যায়। তখন শিক্ষাজীবনে কেবল ক্লাসের পড়াই নয়, পাঠ্যসূচিতে যোগ হয় ‘দায়িত্ব’ নামের এক অধ্যায়। পড়াশোনার জন্য বাইরে বেরিয়ে এমন আরও কী কী শিখি আমরা? কীই-বা শেখা জরুরি?

একজন মানুষকে প্রতিদিন যে খাবারের সন্ধান করতে হয়, তা কখনো উপলব্ধি করেননি মীর রিফাত উস সালেহীন! রিফাত ভিন গ্রহ থেকে আসেননি। ছিলেন ঢাকায়, মা-বাবার ছায়াতলে। কদিন আগে কানাডায় গেছেন পড়তে। পাওয়ার কনফ্লিক্ট অ্যান্ড আইডিয়াজ বিষয়ে ভর্তি হয়েছেন ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায়। জন্মের পর থেকে বাড়িতেই ছিলেন, তাঁর ভালো-মন্দের দায়িত্ব মা-বাবাই পালন করেছেন। কিন্তু কানাডায় যাওয়ার পর এক সন্ধ্যায় ঘরে ফেরার সময় তাঁর উপলব্ধি হলো, আজ আমি কী খাব? কিছু কিনব নাকি রান্না করব? রিফাত বলছিলেন, ‘খিদে পেলে মায়ের কাছে চাইলেই হতো, সামনে খাবার এসে যেত। আমি পড়াশোনা করেছি, ঘুরে বেড়িয়েছি, বাসায় গিয়ে মাকে বলেছি, খেতে দাও। মা-ও খাবার সাজিয়ে দিয়েছেন। জানতাম তো বটেই, কিন্তু কখনো উপলব্ধি করিনি যে খাবার কিনতে হয়, রাঁধতে হয়। এর জন্য আলাদা করে কিছু সময় ও অর্থের প্রয়োজন। এখন সে কাজটি আমাকেই করতে হচ্ছে। বাইরে বেরোনোর পর আমি উপলব্ধি করলাম, জীবনে কত কিছু শেখাই বাকি!’

কত অজানা রে
কেবল রিফাত নন, ঘরছাড়া বেশির ভাগ শিক্ষার্থীরই অনেক কিছু অজানা থাকে। এই না-জানা কখনো কখনো জীবন বদলে দেয়। যেমনটা হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অয়ন চৌধুরীর বেলায়। ময়মনসিংহের অয়ন তৃতীয় বর্ষে পা রাখার আগে সব তালগোল পাকিয়ে ফেলেছিলেন। হঠাৎ এক রাতে মা-বাবাকে ফোন করে কেঁদেকেটে অস্থির। কথার বিষয় ছিল অসংলগ্ন, আচরণ ছিল গোলমেলে। কেন এমন হয়েছিল? এককথায়, নতুন পরিবেশে মা-বাবাকে ছেড়ে একেবারেই মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। পরে অবশ্য পরিবার, বন্ধু, শিক্ষক ও চিকিৎসকের শরণ নিয়ে সব সামলেও নিয়েছেন। অয়ন বলছিলেন, ‘বাইরে এসে আমি তিনটি বিষয় শিখেছি। এক. নিজের যত্ন নিজেকে নিতে হয়। কোনো সমস্যায় পড়লে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বললে কোনো না কোনো সমাধান মেলেই। দুই. দু-একজনকে ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ না বানিয়ে সবাইকে সমান গুরুত্ব দিয়ে বন্ধু বানাতে হয়। এটা করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ পর্যন্ত পাশে অনেককেই পাওয়া যায়। তিন. পরিবেশ সব সময় অনুকূলে না থাকলেও পড়াশোনা ঠিকঠাকভাবে চালিয়ে যেতে হয়। তাহলে চাপমুক্ত থাকা যায়।’

অয়নের সঙ্গে কথা বলার সময় ‘ছুটি’ গল্পের ফটিকের কথা মনে পড়ে গেল। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘…এমন অবস্থায় মাতৃভবন ছাড়া আর-কোনো অপরিচিত স্থান বালকের পক্ষে নরক।’

বাড়ির বাইরে পড়তে গেলে নিজের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হয়। ছবিটি খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে তোলা। ছবি: সাদ্দাম হোসেন

বাড়ির বাইরে পড়তে গেলে নিজের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হয়। ছবিটি খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে তোলা। ছবি: সাদ্দাম হোসেন

প্রসঙ্গটি উঠে এল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাহমুদা আকন্দের সঙ্গে কথা বলার সময়। তিনি বলছিলেন, ‘হোম সিকনেসের কারণে হতাশা তৈরি হয়। পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই এমনটা হলে প্রথমে এমন কারও সঙ্গে কথা বলতে হবে, যিনি বিষয়গুলো বুঝবেন। হতাশা এড়াতে পরিবারের সদস্য, স্কুল-কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখলে খুব উপকার মেলে। তবে এসবে ভয় পেলে চলবে না। বাইরে বেরোলে মানুষ স্বনির্ভর হয়। কেবল নিজের নয়, অন্যেরও দায়িত্ব নিতে শেখে। সহযোগিতা, ছাড় দেওয়া, যেকোনো পরিস্থিতিতে অবিচল থাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতাগুলো অর্জন করা যায়। এই শিক্ষা পরবর্তী সময়ে ভালো নাগরিক হয়ে উঠতেও কাজে দেয়।’

প্রয়োজনে কত কিছু
ভালো নাগরিক, আবার ভালো রাঁধুনিও হয়ে ওঠেন অনেকে। কদিন আগে এক সহকর্মী বলছিলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে মেসে ছিলাম। একদিন খাবার সময় পাতে শাক নিয়ে দেখি, শাক আলাদা হচ্ছে না। পরে দেখি, শাকগুলো আটিবাঁধা অবস্থায় রান্না করে গেছেন বুয়া! সেই থেকে আমি নিজেই রান্না করতে শুরু করলাম।’ এই সহকর্মী এখন পাকা রাঁধুনি, স্ত্রীকে দুবেলা রেঁধে খাওয়াচ্ছেন।

নাবিলা কবিরও ঢাকা থেকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে চুল বাঁধছেন, সঙ্গে রাঁধছেনও। ঢাকায় থাকতে কি এমনটা করতেন? নাবিলা হাসছিলেন, ‘বাড়িতে থাকতে তো এই মাছ খাব না, ওই মাছ খাব না বলে ঘ্যান ঘ্যান করতাম। এখন মোটামুটি সবই খাই। বাড়ির বাইরে এসে এটা শিখেছি। মানুষের সঙ্গে ভালোভাবে মিশতে পারতাম না, এখন সেটাও পারি। সবচেয়ে বড় কথা, নিজের নিরাপত্তা নিজেকেই নিশ্চিত করতে হয়।’

নিঃসন্দেহে নারী শিক্ষার্থীদের বেলায় এটা বাড়তি এবং গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—নিরাপত্তা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলছিলেন, ‘আমি পারব—সব সময় এটা বিশ্বাস করতে হবে। নিরাপত্তার জন্য প্রতিটি পদক্ষেপই গুরুত্বপূর্ণ। বাড়ি ছেড়ে যেখানে থাকবেন, সেখানকার পথঘাট ভালো করে চিনে নেওয়া জরুরি। ভিনদেশে গেলে নতুন দেশ, শহর, পথ, নিয়ম, জরুরি সেবা জেনে রাখতে হবে। বিপদে পড়লে কার সাহায্য নেবেন, সেটাও ঠিক করে রাখতে হবে আগে থেকে।’

বিদেশ-বিভুঁইয়ে
চীনের ঝাওঝুয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অটোমেশন অ্যান্ড ডিজাইন বিষয়ে পড়তে গেছেন মেহেদী হাসান। এক বছর হয়ে গেছে। মেহেদী বাড়িতে থাকতে নিজে রান্না করেছিলেন ঠিকই, তবে কখনো নিজের বাথরুম পরিষ্কার করেননি। চীনে গিয়ে রান্না, নিজের বাথরুম পরিষ্কার করা, কাপড় ধোয়া থেকে শুরু করে বাজারও করছেন। আরও অনেক কিছুই শিখে ফেলেছেন এই এক বছরে। বলছিলেন, ‘প্রথম দিকে এসব করতে খুব একটা ভালো লাগত না। এখন অনেকটাই মানিয়ে নিতে পেরেছি। নতুন আরও অনেক কিছুই শিখছি। তাই চি বলে একধরনের মার্শাল আর্ট শিখছি, চীনা ভাষা তো শিখতেই হচ্ছে। ছুটির দিনে হাইকিংয়ে যাচ্ছি। অনেক দেশের মানুষের সঙ্গে মিশছি। ওদের চিন্তাভাবনা 

বুঝতে পারছি। ওদের সংস্কৃতি উপভোগ করছি, সুযোগ পেলে আমাদের সংস্কৃতিও উপস্থাপন করছি।’

এ প্রসঙ্গে সামিনা লুৎফা বলছিলেন, ‘নতুন কোথাও বা দেশের বাইরে গেলে মানুষকে আরও সহিষ্ণু হতে হয়। অন্যের কথা মন দিয়ে পুরোটা শুনতে হয়। অন্য সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের প্রতি সম্মান দেখানোই ভদ্রতা। ভিনদেশে যাওয়ার আগে এগুলো জেনে রাখতে হবে।’

আরও কিছু পরামর্শ
পরামর্শগুলো দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাহমুদা আকন্দ।

১. সবার সঙ্গেই মিশতে হবে। তবে অল্প দিনের পরিচয়ে কারও কাছে নিজেকে উজাড় করে দেওয়া যাবে না। মানুষকে বিশ্বাস করতেই হবে। তবে অতি বিশ্বাস মোটেও ভালো নয়।

২. বাড়ির বাইরে থাকলে স্বনির্ভর তো হতেই হবে। এ ছাড়া উপযুক্ত ব্যক্তির কাছে সহযোগিতা চাওয়াও শিখতে হয়। উপযুক্ত ব্যক্তি বলতে যিনি সত্যিকার অর্থেই সহযোগিতা করার মতো। ফলে মানুষ চেনাও জরুরি শিক্ষা।

৩. বাড়ির বাইরে যেখানেই থাকুন না কেন, সব জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ অনেক কিছু শেখার থাকে। বন্ধুত্ব, ক্যারিয়ার, বিনোদন থেকে শুরু করে নতুন অনেক কিছুই শেখার আছে। বিশেষ করে ঢাকায় এই সুযোগগুলো বেশি। পাঠ্যবইয়ের বাইরের অনেক কিছুই পড়ার থাকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে।

৪. প্রতিটি মানুষের ভেতরেই নিজের দক্ষতা ও ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা থাকে। মনে যেকোনো সন্দেহ হলে এগুলোর ওপর আস্থা রাখতে হবে।

৫. পরিবারের বাইরে থাকলে মাদক একটি বড় চিন্তার কারণ। এ কারণে বন্ধু বাছাইয়ের বেলায় সাবধানী হতে হয়।

৬. পড়াশোনার বাইরে ভালো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হলে খুব ভালো। এতে সময় কাটে আনন্দে, শেখাও হয়ে যায় অনেক কিছু। সবচেয়ে বড় কথা, নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়। নতুন মানুষ মানেই নতুন বিষয়, আরও আনন্দ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *