শিশুরা গল্পের বই পড়বে কখন?

বই জীবনীশক্তি সঞ্চার করে, মনের ক্ষুধা মেটায়, অন্তর্চক্ষু খুলে দেয়। মানুষের চোখ কিন্তু মাছির চোখের মতো নয়। মাছির মাথার চারদিকে অসংখ্য চোখ রয়েছে। মানুষের যদিও দুইখানা চোখ দৃশ্যমান হয়, কিন্তু মানুষের অন্তর্চক্ষুর সংখ্যা অনেক। এই অসংখ্য চোখ প্রস্ফুটিত হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে বই। জগতের ইতিহাস-ঐতিহ্য, নীতি-আদর্শ, কৃষ্টি-সভ্যতা, সাহিত্য-সংস্কৃতিসহ তাবৎ জ্ঞান বইয়ের মধ্যে থাকে। বই মানুষের মনকে শীতল রাখে, মস্তিষ্ককে সচল রাখে, সহানুভূতিশীল ও আত্মনির্ভরশীল করে, বিষণ্নতা দূর করে—আরও কত–কী! কিন্তু আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বই পড়ছে কি? বই পড়ার চর্চা না থাকলে কীভাবে ওদের অন্তর্চক্ষু প্রস্ফুটিত হবে! এখনকার শিশুরা ছড়া-কবিতা-গল্পের বই না পড়েই বড় হচ্ছে। তবে বই না পড়ার দায় পুরোপুরি শিশুদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। কারণ, আমরা বড়রা শিশুদের জন্য এমন এক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করেছি, যা তাদের শুধু স্কুলনির্ভর পাঠ্যবই পড়ার চক্রে বন্দী করে ফেলেছে। পাঠ্যবইয়ের চাপেই শিশুদের ত্রাহি অবস্থা, এর সঙ্গে আবার যোগ হয়েছে অসংখ্য অনুমোদনহীন বইয়ের বোঝা। এসব বইয়ের চাপ সামলিয়ে শিশুরা ছড়া, কবিতা আর গল্পের বই পড়বে কখন। আমরা সবাই জানি, পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি অন্যান্য বই শিশুর পঠন দক্ষতাকে সমৃদ্ধ করে, শিশুর মনোজগতের বিকাশকে ত্বরান্বিত করে। তবে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি অন্যান্য বই পড়ার জন্য প্রয়োজন খানিকটা অবসর। কিন্তু স্কুল, কোচিং আর গৃহশিক্ষকের চাপে চিড়ে–চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া শিশুদের কাছে গল্পের বই পড়া যেন বিলাসিতা। 

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ এমনকি উচ্চ আদালতের রায়ের পরও শিশুদের কাঁধ থেকে নামছে না বইয়ের বোঝা। শিশুদের ওপর অনুমোদনহীন বই চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই সরকারের। এমনকি অনেক সরকারি স্কুলেও মানা হচ্ছে না সরকারি নির্দেশনা। কিন্ডারগার্টেন আর ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোতে চলছে নৈরাজ্য। এদের সামলানোর কেউ নেই। প্রি-প্রাইমারি স্তরেই শিশুদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় ছয়–সাতটি বইয়ের বোঝা। পরবর্তী শ্রেণিগুলোতে জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে বইয়ের সংখ্যা। কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার বই শিশুপাঠ্যভুক্ত করা হয় স্কুলগুলোতে। এত বিপুলসংখ্যক বই শিশুদের ওপর চাপিয়ে স্কুলের ব্র্যান্ডিং হয়তো পাকাপোক্ত হয়, কিন্তু শিশুর প্রারম্ভিক শিক্ষার ভিত্তি হয় নড়বড়ে। এর ফলাফল শিশুটিকে সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হয়। একটি বিষয় আত্মস্থ হওয়ার আগেই আরেকটি বিষয় এসে হাজির হয়। 

দুর্বল ভিত্তির ওপর একের পর এক নতুন তথ্য আর জ্ঞানের বোঝা সামলাতে সামলাতে একসময় ধসে পড়ার উপক্রম হয় শিশুর শিক্ষার ভিত্তি। এর প্রমাণও মিলেছে বিভিন্ন সময়ে। শিশুর শিক্ষার ওপর সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের একটি জরিপ প্রকাশিত হয়েছে। সেই জরিপে দেখা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে বাংলাদেশে প্রায় ৬৫ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলা পড়তেই পারে না। মনে পড়ে, ২০১৫ সালে ন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্টে বেরিয়ে এসেছিল বাংলাদেশের প্রাথমিক স্তরে ৭৭ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলায় এবং ৯০ শতাংশ শিশু গণিতে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি। 

ইংরেজি কিংবা বাংলা, মাধ্যম যা–ই হোক না কেন, শিশুর জ্ঞানের বিকাশে নির্দিষ্ট ভাষায় দক্ষতা লাভ করার কোনো বিকল্প নেই। ভাষার ওপর দক্ষতা লাভের প্রথম শর্ত হলো সঠিকভাবে তা পড়তে পারার যোগ্যতা। শুধু পাঠ্যবই পড়ে যা অর্জন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই প্রয়োজন শিশুর জন্য অন্যান্য বই পড়ার পরিবেশ সৃষ্টি করা। পড়া অর্থ কিন্তু শুধুই পড়ে যাওয়া নয়। পড়া কখনোই অর্থবহ হবে না, যদি বই পড়ে শিশুরা এর অর্থ বুঝতে না পারে। পড়ার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত গতিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘রুম টু রিড’ বাংলাদেশের শিশুদের পঠন দক্ষতার ওপর একটি জরিপ পরিচালনা করেছিল। সেখানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীরা শব্দ বুঝে উচ্চারণ করে মিনিটে গড়ে ৩৩টি শব্দের বেশি পড়তে পারে না। অথচ আন্তর্জাতিকভাবে শিক্ষার এই ধাপে শব্দ বুঝে মাতৃভাষা উচ্চারণ করে পড়তে পারার হার মিনিটে ৪৫ থেকে ৬০টি শব্দ। 

তাই যেখানে শিক্ষার ন্যূনতম গুণগত মান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, সেখানে কী লাভ পর্বতসম পড়ার চাপ শিশুদের ওপর চাপিয়ে! আমরা সবাই জানি, বর্তমানে প্রাথমিকে প্রায় শতভাগ শিশুর ভর্তির কথা, কমে গেছে শিশু ঝরে পড়ার হার, পাসের হার ধারাবাহিকভাবে বাড়ছেই। এই যখন প্রাথমিক শিক্ষায় আমাদের অর্জন, তখন ৬৫ শতাংশ শিশুর বাংলা পড়তে না পারার বিষয়টি ভাবিয়ে তোলে বৈকি। শিশুদের কাঁধে বইয়ের বোঝা অথচ তারা পড়তে পারে না। অন্তঃসারশূন্য এই শিক্ষার দায় কে নেবে? পঞ্চম শ্রেণি শেষ করেও ৩২ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী স্বাক্ষরতা অর্জন করতে পারে না (এডুকেশন ওয়াচ রিপোর্ট, ২০১৬)। এর চেয়ে হতাশাব্যঞ্জক আর কী হতে পারে! 

শিশুদের যেকোনো মূল্যে আবার বইমুখী করতে হবে। রাশি রাশি পাঠ্যবই আর আনুষঙ্গিক বইয়ের বোঝা না পারছে শিশুদের কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতা এনে দিতে, না পারছে মনোজগতের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে। বই পড়ার আসক্তি বড় আসক্তি, যে আসক্তিতে কোনো ক্ষতি নেই। এই আসক্তি সৃষ্টি করতে প্রয়োজন শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত অবসর, বিনোদনের ব্যবস্থা করা, যা প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতিতে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। আপাতত আর কিছু না হোক অন্তত অনুমোদনবিহীন বইয়ের চাপমুক্ত হোক শৈশব। কিন্ডারগার্টেন এমনকি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোর স্বেচ্ছাচারিতার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা জরুরি। শিশুর মনের রঙিন কল্পনাগুলো যেন পাখা মেলতে পারে, সে জন্য প্রয়োজন অচিরেই গল্প-ছড়া-কবিতার রাজ্যে শিশুদের ফিরিয়ে আনা।

নিশাত সুলতানা: লেখক ও গবেষক 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Personel Sağlık