শিশু গৃহকর্মীর সুরক্ষা এবং দায়িত্বহীনতা

শিশু গৃহকর্মী! এটি সভ্য দেশে বেমানান। তবুও বাংলাদেশের রাজধানীসহ শহরগুলোতে শিশু গৃহকর্মী অগণিত। গ্রামগুলোতেও শিশু গৃহকর্মীর সংখ্যা অনেক। যে বয়সে খেলাধুলা করা আর বইপুস্তক হাতে নিয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা- সে বয়সে শুধু জীবিকার জন্য বিপুলসংখ্যক শিশু বিভিন্ন বাসাবাড়িতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। শিশুসুলভ ছোটখাটো ভুলের জন্য প্রতিনিয়তই তারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। অনেক সময় নির্দয় নির্যাতনের ফলে অকালে ঝরে যায় অনেক প্রাণ। দেশে শিশু গৃহকর্মী নির্যাতন আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। সংবাদপত্রের শিরোনাম হচ্ছে। নির্যাতনের শিকার শিশু গৃহকর্মীর সংখ্যা। বছরে কয়েক হাজার ছাড়িয়ে যায়। এদের অনেকে নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আত্মহননের মতো পথও বেছে নিচ্ছে। শিশু গৃহকর্মী নির্যাতন কিংবা হত্যা বা আত্মহত্যার সঠিক পরিসংখ্যান নেই পুলিশের কাছে। অনেকে শিশু গৃহকর্মীকে হত্যার পর ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেন। এ অভিযোগ রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধেও। এ ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের উৎকোচ লেনদেনের কথা শোনা যায়। শিশু শ্রমিকদের মধ্যে শিশু গৃহকর্মীদের গোত্রভুক্ত করা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের এই রাজধানীতে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় সাত লাখ আট হাজার। এর মধ্যে তিন লাখ ৮৭ হাজার শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। জীবনের তাগিদে পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিতে কোমলমতি এসব শিশুকে বিপজ্জনক কাজ করতে হচ্ছে। ফলে তারা নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে- এমনকি মৃত্যুবরণও করছে। জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ অনুযায়ী সারা দেশে ৩১ লাখ ৭৯ হাজার শিশু শ্রমিক রয়েছে। ২০০২ -২০০৩ সালে এই জরিপ করা হয়েছিল। এর পরে আর কোনো জরিপ হয়নি এ ক্ষেত্রে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং ইউনিসেফ পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে প্রায় ৩০০ ধরনের অর্থনৈতিক কাজে শিশুরা শ্রম দিচ্ছে। সমীক্ষায় দেখা যায়, ৪১.৫ শতাংশ অর্থাৎ তিন হাজার ৮২০টি শিশুর বয়স ১০ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০০৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১৫ বছর বয়সী গৃহশ্রমিকের সংখ্যা প্রায় তিন লাখ ৩১ হাজার। পরে এই সংখ্যা আরো বেড়েছে। অথচ এই বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের পরিচালনা বা নিয়ন্ত্রণে নেই সরকারি নীতিমালা। তবে একটা খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে গৃহশ্রমিকের সংখ্যা ২০ লাখের বেশি যাদের মধ্যে ৮০ শতাংশই নারী ও শিশু শ্রমিক। এই নারী ও শিশুরাই নির্যাতনের শিকার হচ্ছে বেশি।

সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অব রিসার্চ, বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এবং চিল্ড্রেন কালচারাল ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা যায়, নগরায়ন ও শিল্পায়নের পাশাপাশি জীবন-জীবিকার কারণে মানুষ আজ শহরমুখী। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার গঠিত হচ্ছে। এসব পরিবারে স্বামী-স্ত্রী প্রায়ই কর্মরত থাকেন। সে ক্ষেত্রে গৃহকর্মী রাখা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। দারিদ্র্যের কষাঘাতে যখন বাবা সন্তানদের ভরণপোষণে ব্যর্থ হন, কেবল তখনই তার সন্তানকে বাইরে কাজ করতে পাঠান। ফলে শিশুটির পক্ষে পারিবারিক আবহে থাকা সম্ভব হয় না। অল্প বয়স থেকেই সে অপরিচিত পরিবেশে নিজেকে খাপ খাওয়াতে চেষ্টা করে। সে পরিবেশের মানুষ যদি হয় নিষ্ঠুর, তাহলে তার অস্তিত্ব রক্ষা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। যখন একটি শিশুর সুকুমার বৃত্তিগুলো প্রস্ফুটিত হওয়ার সময়, তখন অঙ্কুরেই তা বিনষ্ট হয়ে যায়। এসব শিশুর অভিভাবক যেমন ১০-১৫ বছর ধরে একটি শিশুর লেখাপড়া চালানোকে অলাভজনক মনে করেন, তেমনি গৃহকর্তা-গৃহকর্ত্রীও নিজের সংসারের কাজকর্মের বাইরে তার স্কুলে যাওয়াকে মেনে নিতে পারেন না। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্ট্যাডিজ (বিলস) সূত্রে জানা যায়, বাসার কাজের মেয়েদের ওপর নির্যাতন আত্মহত্যা সম্পর্কে কয়েক বছর আগেও চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থানার এসআই শাহেদ আলীর বাসায় ১০ বছরের রোমেলা খাতুন নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। পান থেকে চুন খসলেই তার পিঠের চামড়া আর অক্ষত থাকত না। প্রতিনিয়ত সে নির্যাতনের শিকার হতো। লাগাতার মারধরে মেয়েটি ক্ষতবিক্ষত ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পাবনার এই মেয়েটি কয়েকবার আত্মহত্যারও ব্যর্থ চেষ্টা করেছে। একবার বেধড়ক পিটুনিতে তার মুখ কেটে গেলে গৃহকর্ত্রী নিজেই কাপড় সেলাইয়ের সুই-সুতা দিয়ে সেটা সেলাই করে দেন। গৃহশ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্কের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দেশে গত ১৫ বছরে গৃহকর্মীদের ওপর অমানবিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে কয়েক হাজার। এর মধ্যে নির্যাতনে নিহত হয়েছে ৩৯৮ জন, মারাত্মকভাবে আহত ২৯৯ এবং অন্যান্য নির্যাতনের শিকার সহস্রাধিক। গৃহকর্মীরা মারা যাওয়ার পর গৃহকর্তা বা গৃহকর্ত্রীর কাছ থেকে পুলিশ টাকার বিনিময়ে তা ‘অপমৃত্যু ও আত্মহত্যা’ হিসেবে চালিয়ে দিচ্ছে বলে নেটওয়ার্কের দাবি।

বিলস ও সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে যে গৃহশ্রমিকদের কারোরই নিয়োগ চুক্তি নেই। তাদের গড় মজুরি ৫০৯.৬ টাকা। এর মধ্যে নিয়মিত মজুরি পায় ৬০ শতাংশ এবং অনিয়মিত পায় ৪০ শতাংশ। এত অল্প মজুরির বিনিময়েও নানা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে তারা। ওদের ৬৬.৬৭ শতাংশ শিক্ষার সুযোগ এবং ৫৩.৩৩ চিত্তবিনোদনের সুযোগ পায় না। বকাঝকার শিকার হয় ৮৩.৩৩ শতাংশ, শারীরিক নির্যাতনের শিকার ৪৬.৬৭ শতাংশ, সামর্থ্যরে অতিরিক্ত কাজ করে ৬৩.৩৩ শতাংশ, যৌননিপীড়ন সহ্য করে ১৬.৬৭ শতাংশ, মানসিক হতাশায় ভোগে ৬৭.৬৭ শতাংশ। গৃহশ্রমিকের ঘুমানোর যথার্থ স্থানও দেয়া হয় না। ড্রইং রুমে ২০ শতাংশ, রান্নাঘরে ৩৩.৩৩ শতাংশ, বারান্দায় ১৬.৬৭, স্টোর রুমে ৩.৩৩, বেড রুমের মেঝেতে ২০.৬৭ এবং আলাদা রুমে মাত্র ৬.৬৭ শতাংশ গৃহকর্মী ঘুমায়। বেসরকারি সংস্থা ‘নারী মৈত্রী’র এক প্রতিবেদনে জানা যায়, বাসাবাড়ির কাজে নিযুক্ত ৯৫ শতাংশ শিশু গৃহকর্তা বা গৃহকর্ত্রীই নির্যাতনের শিকার। পরিবারের প্রধান কর্তা ছাড়াও নির্যাতনকারীদের ৩০ শতাংশ পরিবারের অন্যান্য সদস্য। এসব শিশুর মধ্যে ৫২ শতাংশ নিয়মিত নির্যাতিত হচ্ছে। মৌখিক (গালি) নির্যাতনের শিকার ৯৫ শতাংশ। আর ৮৬ শতাংশ শিশু শারীরিকভাবে নির্যাতিত। ৯৩ শতাংশ নিয়মিত খাবার পায়, আর ৮২ শতাংশ পরিবার খাবার দেয় সময়মতো। বিলস সূত্রে জানা যায়, অনেক গৃহশ্রমিকের হত্যার পর গৃহকর্তা বা গৃহকর্ত্রীকে বাঁচাতে ঘটনাটি ‘আত্মহত্যা’ বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে এবং তদন্তে পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যের ওপর গুরুত্ব ঠিকমতো দেয়া হচ্ছে না।

আজো গৃহশ্রমিকদের সুরক্ষায় ও কল্যাণে সরকারের কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা’-এর খসড়া ২০০৯ সাল থেকেই মন্ত্রণালয়ে ‘ঘষামাজা’ চলছে। ফৌজদারি আইনের আওতায় নির্যাতনের শিকার গৃহশ্রমিক ও তাদের অভিভাবকরা সুরক্ষা পাচ্ছেন না। কেননা, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নির্যাতনকারী প্রভাবশালী কেউ। উল্লেখ্য, ১৯৮৯ সালের ২০ নভেম্বর জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদ ‘জাতিসঙ্ঘ শিশু অধিকার সনদ অনুমোদন ও গ্রহণ করেছে। ১৯৯০ সালের ৩ আগস্ট বাংলাদেশ এই সনদে অনুসমর্থন করে সংশ্লিষ্ট আইন বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার গ্রহণ করে। বাংলাদেশের সংবিধানে শিশুসহ সব নাগরিকের মৌলিক অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। স্বাধীনতা লাভের পর ‘শিশু আইন ১৯৭৪ প্রবর্তিত হয়। এখানে শিশুর সংজ্ঞা, শিশুর বয়স, তার অধিকারের পরিধি প্রভৃতি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এ শিশু বা কিশোরদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টার জন্য শর্তাধীনে নির্ধারিত হালকা কাজে নিয়োজিত করার বিধান রয়েছে।

জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি-২০১০ এর আলোকে সরকার ২০১৫ সালের মধ্যে শিশুশ্রম নির্মূলের লক্ষ্যে পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এই নীতি অনুযায়ী যেসব শিশু দৈনিক সর্বোচ্চ ৫ কর্মঘণ্টার অতিরিক্ত সময় অথবা বিনা মজুরি, অনিয়মিত মজুরি, স্বল্প মজুরিতে কাজ করে এবং বাধ্য হয়ে কাজ করে, সেসব ক্ষেত্রে মালিক, নিয়োগকর্তা, শিশু এবং শিশুর অভিভাবকের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুকে সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে নিয়োগ না করা উচিত। তাদের লেখাপড়া, থাকা-খাওয়া, আনন্দ-বিনোদনের ব্যবস্থা করার শর্ত নির্ধারণ করে দেয়া হয়। শিশুদের সপ্তাহে অন্তত এক দিন ছুটির ব্যবস্থা থাকতে হবে। নির্দিষ্ট হারে নিয়মিত বেতন পাওয়ার অধিকারও তাদের রয়েছে। ‘বাংলাদেশ চিল্ড্রেন কালচারাল ফাউন্ডেশনের’ প্রতিবেদনে জানা যায়, কোমলমতি শিশুরা বিভিন্ন বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে। সংসারের সার্বক্ষণিক দেখাশোনা ছাড়াও সন্তান পালন, পানি তোলা, ঘর মোছা, হাঁড়িবাসন ও কাপড়-চোপড় পরিষ্কার করা, সবজি কাটা, বাটনা বাটাসহ যাবতীয় কাজ তারা করে থাকে। বিনিময়ে পায় ন্যূনতম খাবার সংস্থান (যার বেশির ভাগই উচ্ছিষ্ট, পচাবাসি), ব্যবহৃত পোশাক পরিচ্ছদ। তারা ব্যবহার পায় ক্রীতদাসের মতো। তাদের অনুভূতি প্রকাশ করতে মানা, তাদের পড়ালেখা করতে মানা। আছে চলাচলের ওপর থাকে কড়া নজরদারি। তাদের বোবা ভাষা চার দেয়ালে গুমরে গুমরে কাঁদে। অনেক সময় গৃহকর্তা-গৃহকর্ত্রী তাদের তালাচাবি বন্ধ করে কর্মক্ষেত্রে চলে যান। ফলে কারাজীবনের মতো কাটাতে বাধ্য হয়। তাদের অধিকার, পাওনার কথা খুব কমই গোচরে আসে। গোচরে আসে কেবল তখনই, যখন তারা নির্যাতনে মৃত্যুশয্যায়। যে মা-বাবা তাদের প্রিয় সন্তানকে অভাবের তাড়নায় বাসায় কাজ করতে পাঠান তারা মনে করেন, হয়তো ভালোই আছে আদরের সন্তান। তবে দুটির জায়গায় তিনটি মরিচ পোড়ানোর জন্য, ভাত বেশি গলে বা পুড়ে গেলে, গৃহকর্ত্রীর সন্তান একটু আঘাত পেলে, প্লেট ভেঙে ফেললে, ইত্যাদি কারণে একজন গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়। তার হিসাব কেউ রাখে না। অনেক সময় তারা যৌন নির্যাতনেরও শিকার হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে তারা বেশির ভাগ সময়ই পাশে পায় না কাউকে। তাদের দিনে ১২-১৫ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। তাদের নেই কোনো ছুটি, নেই অবসর। তাদের খাবার দেয়া হয় সবার শেষে। ঘুমাতে দেয়া হয় মেঝেতে। আমরা নির্যাতনের যেসব চিত্র দেখতে পাই তার সবই মধ্যযুগীয় বর্বরতা। অথচ এরা বেশির ভাগই শিক্ষিত পরিবারে কাজ করে। পবিত্র ইসলাম ধর্মে রয়েছে, তোমরা নিজেরা যা খাবে-পরবে, কাজের লোকদেরও তা-ই খেতে-পরতে দেবে। ইসলামে তাদের অধিকার এবং অন্যের ব্যাপারে অবহেলাকে জুলুম বলা হয়েছে। ক্রীতদাসপ্রথা বিলুপ্ত হয়েছে সেই কবে। কিন্তু মানুষের মনে প্রভুত্ব করার বাসনা আছে আজো। তাই তো অসহায় ও নিরীহ গৃহকর্মীর ওপরেও চলে নির্যাতনের স্টিমরোলার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *