স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খেয়ে, সুস্থ ও স্মাট থাকুন।

প্রতি বছর বিশ্বে দেড় কোটি শিশু মারা যায় ক্ষুধার্ত অবস্থায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ ক্ষুধার্ত। প্রতি ৩.৬ সেকেন্ডে একজন মারা যায় ক্ষুধার তাড়নায়। পৃথিবীর প্রায় ১০০ কোটি মানুষ অপুষ্টিতে ভোগে। বিশ্বব্যাংকের এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, অপুষ্টিতে আক্রান্ত এসব মানুষের ৮০ শতাংশ শিশু ও মহিলা। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলোর প্রায় ৫০ কোটি শিশু অপুষ্টিতে আক্রান্ত। প্রতিবছর ৫ বছরের কম বয়স্ক প্রায় ৮৫ লাখ শিশু নামেমাত্র বেঁচে থাকলেও উপবাসের কারণে কোনো না কোনো সময় মৃত্যুবরণের জন্য দিন গোনে।

এবার একটি বিপরীতধর্মী প্রসঙ্গ। ২০১০ সালের ফেব্র“য়ারিতে মার্কিন ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা যুক্তরাষ্ট্রের শিশুদের অতিশয় স্থূলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। মেয়রদের সম্মেলনে বক্তৃতা প্রদানকালে তিনি বলেন, স্থূলতা মহামারী আকারে দেখা দিয়েছে এবং এই স্থূলতা আমেরিকার স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্য এক মহাবিপদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। শরীরে মাত্রাতিরিক্ত চর্বি জমা হলে মানুষ অস্বাভাবিক মোটা হয়ে যায়। জেনেটিক বা জৈবিক কারণ ছাড়াও মানুষের জীবনপদ্ধতি স্থূলতার জন্য বিশেষভাবে দায়ী। সহজভাষায়, মানুষ খাবারের মাধ্যমে অতি বেশি পরিমাণে ক্যালরি গ্রহণ করার পর যৎসামান্য ক্যালরি খরচ করলে অর্থাৎ পর্যাপ্ত ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রম না করলে তার ওজন বাড়তে শুরু করে। অর্থাৎ ক্যালরি গ্রহণ ও খরচের মধ্যে ভারসাম্য থাকতে হবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা গেছে স্থূলতার সঙ্গে প্রাচুর্যের একটি নিবিড় যোগসূত্র রয়েছে। যাদের অনেক টাকাকড়ি আছে, তারা প্রচুর ক্যালরি সমৃদ্ধ খাবার বেশি খায় এবং ঘন ঘন খায়। প্রয়োজনের তুলনায় অতি বেশি ক্যালরি শরীর কাজে লাগাতে পারে না। তাই বাড়তি ক্যালরি শরীর চর্বিতে রূপান্তরিত করে শরীরে পুঞ্জীভূত করে। যুক্তরাষ্ট্রে ঠিক এটিই ঘটে যাচ্ছে আর তা মিশেল ওবামার দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান মোতাবেক যুক্তরাষ্ট্রের ৩২ শতাংশ শিশু ও কিশোর স্থূলতায় আক্রান্ত। ৬ থেকে ১১ বছর বয়স্ক ২০ শতাংশ এবং ১২ থেকে ১৯ বছর বয়স্ক ১৮ শতাংশ শিশু-কিশোর স্থূল। যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে এসব শিশু-কিশোর মোটা মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠবে এবং বাকি জীবন স্থূলতা নিয়ে কাটাবে। বিপদ আরও আছে। অতি স্থূল মানুষ সহজেই ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, স্ট্রোক ও হৃদরোগে আক্রান্ত হয় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ করে। অতিকায় দেহ বা ওজন নিয়ে মানুষ বেশি চলাফেরা বা কাজকর্ম করতে পারে না। এতে করে কর্মক্ষমতা ও কর্মদক্ষতা হ্রাস পাওয়ার কারণে শারীরিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। মিশেল ওবামার পরিকল্পনা মোতাবেক স্থূলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার মৌলিক পদক্ষেপ হল কম খাওয়া এবং ওজন কমানোর জন্য বেশি পরিশ্রম বা ব্যায়াম করা। বেশি থাকতে কম খাওয়া- এ এক দুঃসাধ্য ব্যাপার।

আমি বহু দেশে গেছি। জাপান ছাড়া আর সব উন্নত দেশে মানুষের লাইফস্টাইল প্রায় একই রকম। জাপানিদের খাওয়া-দাওয়া সুষম ও স্বাস্থ্যসম্মত বলে সেখানে স্থূলতা এখনও মহামারী আকারে দেখা দেয়নি। কিন্তু অন্যান্য উন্নত দেশে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে খাবার-দাবারের প্রাচুর্য চোখে পড়ার মতো, দামেও সস্তা। উন্নত বিশ্বের শিশু-কিশোর এমনকি প্রাপ্তবয়স্কদের প্রিয় ও আকর্ষণীয় খাবারের তালিকায় রয়েছে আইসক্রিম, জাঙ্ক ফুড ও প্রচুর চিনি সমৃদ্ধ কোমল পানীয়। প্রায়ই সবগুলো আইটেমই হয় জাম্বো সাইজের। ক্যালরিতে ভরপুর এসব খাবার ঘন ঘন খেলে যে কোনো শিশু-কিশোর অল্প সময়ের মধ্যে মোটা হতে শুরু করলেও তাদের খাবারের প্রতি অনীহা থাকে না এবং আকর্ষণ বাড়ে অতিমাত্রায়। খাবারের প্রতি আকর্ষণ মানুষকে আরও বেশি পরিমাণে খেতে প্রলুব্ধ করে। ফলে ওজনও বাড়ে সমানতালে।

আপনার শরীরে ওজন স্বাভাবিক আছে কি-না তা বুঝবেন কী করে? আসুন ঝটপট একটা অংক করে আপনাকে উত্তরটা বলে দিই। আপনার শরীরের ওজন স্বাভাবিক, না বেশি তা নির্ণয় করা হয় বিএমআই বা বডি মাস ইনডেক্স দিয়ে। বিএমআই নির্ণয়ের নিয়মটা মনে রাখবেন। শরীরের ওজনকে উচ্চতার বর্গফল দিয়ে ভাগ করলে যে ফল পাওয়া যাবে তাকে বিএমআই বলা হয়। স্বাভাবিক বিএমআই স্কেল হল ১৮.৫ থেকে ২৪.৯। ধরুন আপনার শরীরের ওজন ৬৮ কেজি এবং উচ্চতা ১.৭৩ মি.। আপনার বিএমআই হল ৬৮ ভাগ বা ২:৯৯ এবং ফলাফল ২২.৭৪। ফলাফল অনুসারে আপনার ওজন একদম পারফেক্ট। বিএমআই ২৪.৯-এর বেশি হলে আপনার শরীরের ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি এবং ১৮.৫-এর কম হলে ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম ধরা হবে। মনে রাখবেন, শরীরের ওজন কমিয়ে বা বাড়িয়ে বিএমআই স্বাভাবিক পর্যায়ে আনার সুযোগ রয়েছে আপনার।

বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে খাদ্যের সুষম বণ্টন কোনো সময়েই বাস্তবে রূপ লাভ করবে বলে আশা করার কারণ নেই। তাই এই অসম সমাজ ব্যবস্থায় কেউ না খেয়ে মরবে, আর কেউ অতিমাত্রায় খেয়ে মারা যাবে। দুটিই জাতীয় সংকট। এই সংকট উত্তরণে অশুভ ব্যবসায়িক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে এসেছে বিশ্বের ওষুধ কোম্পানিগুলো। কিছুদিন আগে এফডিএ (ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) একটি কোম্পানির স্থূলতা কমানোর ওষুধ বেলবিক বাজারজাত করার অনুমতি প্রদান করেছে।

ওজন কমানোর ওষুধগুলো সাধারণত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত হয় না। এ ধরনের বেশকিছু ওষুধের ইতিহাস ভালো নয়। যুক্তরাষ্ট্রের হেলথ রিসার্চ গ্র“পের পরিচালক ড. সিডনি ওলফ ওজন কমানোর কার্যকর ওষুধ আবিষ্কৃত হবে বলে আশাবাদী নন। তিনি বলেন, এমন কোনো ওষুধ পাওয়ার সম্ভাবনা শূন্য, যা শুধু নিরাপদে ওজন কমাবে অথচ কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকবে না।

স্থূলকায় লোকদের উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস ছাড়াও স্ট্রোক ও হৃদরোগের ঝুঁকি বেশি থাকে। ওজন কমানোর ওষুধ প্রদানের মাধ্যমে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে স্ট্রোক ও হৃদরোগের ঝুঁকি আরও অনেকগুণ বেড়ে যায়। এটা অনেকটা মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা-এর মতো। শুধু বেশি খাবার খাওয়ার জন্যই সব সময় ওজন বাড়ে না, ওজন বাড়ার সঙ্গে খাবার ছাড়াও আবেগ, জৈবিক, সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক, পরিবেশসহ আরও বহু কারণ জড়িয়ে আছে। সুতরাং এতগুলো বহুমুখী সমস্যা সমাধানের জন্য একটিমাত্র বড়ি আবিষ্কার রীতিমতো অসম্ভব ব্যাপার। বিশ্বায়নে যুগে আজকাল সব দেশেই ক্যালরি সমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে লবণ, চিনি ও চর্বি জুড়ে তার স্বাদ বাড়ানো হচ্ছে। অন্যদিকে বিজ্ঞাপন ও সামাজিক স্ট্যাটাস প্রতিনিয়ত আমাদের অতিভোজনে প্ররোচিত করছে। লোভনীয় খাবারের ছবি ও বর্ণনা আমাদের লোভকে অতিমাত্রায় উসকে দিচ্ছে। তাই আমরা খাচ্ছি আর মোটা হচ্ছি।

এ অবস্থায় করণীয় কী? করণীয় একটা আছে। তা শক্ত হলেও অসম্ভব নয়। আমাদের লোভ সংবরণ করতে হবে। আমি বলি- যার জিহ্বা সংযত তার স্বাস্থ্য সুসংহত। আগে যেমন বলছি- শরীরের প্রয়োজনে অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ করলে তা জ্বালিয়ে দিতে হবে, জমতে দেয়া যাবে না। সুষম খাবার উৎকৃষ্ট খাবার। ক্যালরি জ্বালাতে হলে আমাদের একটু কষ্ট করতে হবে। আর তা হল ব্যায়াম ও শারীরিক পরিশ্রম। লাইফস্টাইল পরিবর্তন, সুষম খাবার, শারীরিক পরিশ্রম, ব্যায়াম মানুষকে শারীরিক ও মানসিকভাবে ফিট রাখে, সুস্থ রাখে। শরীর ফিট ও সুস্থ থাকলে মানুষকে দেখতেও সুন্দর ও স্মার্ট লাগে। আর এ দুনিয়ায় সুন্দর ও স্মার্ট থাকতে কে না চায়!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *